সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি 

সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট আমাদের কাছে অনেকটাই স্পষ্ট। এই বাংলাদেশ জন্মের পর থেকেই আমরা এমন কিছু বিষয় দেখে আসছি, এখানে একটি শ্রেণী সব সময় লুটপাট করতে অভ্যস্ত আরেকটি শ্রেণী তাদেরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যে মনোভাবের মানুষগুলো দেশের সেবার জন্য রাজনীতিকে বেছে নেয় তারাই কোনঠাসা হয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ বিষয়টার সাথে আরো কিছু বিষয় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত যার কারণে আমরা দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না। বিষয়গুলো কিএক. রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র  দুই. প্রতিহিংসাপরায়ন রাজনৈতিক আচরন  তিন. সুশিক্ষিত বিবেকবান মানুষের রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধা  চার. রাজনীতির সাথে প্রশাসনের সম্পর্ক সমঝোতা

প্রথমত পরিবারতন্ত্র থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারছি না কোনভাবে, এর মূল কারন হলো আমাদের রাজনীতিতে দুই তিনটি পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও দীর্ঘসময় পরেও এই কয়েকটি পরিবার নিজেদের একচ্ছত্র ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মূলত দল ব্যক্তিবিশেষকে ঘিরে ইমোশনাল বা আবেগী পরিবেশ তৈরী করে রেখেছে যেটা ‍পৃথিবীতে বিরল। সারাবিশ্বে দেশের জন্য যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের সম্মান জানানো কিংবা তাদের স্মরণ করার বিষয়টি রাষ্টীয়ভাবে হলেও আমাদের এখানে তা দলীয় কাঠামোয় পরিচালিত হয় এতে করে এক দলের সাথে অন্যদলগুলোর আদর্শগত পার্থক্য দেখা দেয়। /১১ সময়কালীন এই পরিবারতন্ত্র থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা হলেও তা কার্যত ব্যর্থ হয়। কিন্তু  একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে /১১ সময়কালীন দেশে লুটপাট, অরাজকতা, দূর্নীতি, ব্যাংকগুলোর মূলধন হারানোর কোন চিত্র ছিল না। যে গনতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে /১১ সময়কালীন সরকারকে বিব্রত করা হয়েছিল এখন সেই গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি ভুলুণ্ঠিত। মানুষের ভোটাধিকার মানবিক অধিকার আজ নিষ্পেষিত।

দ্বিতীয়ত প্রতিহিংসাপরায়ন রাজনৈতিক আচরন এর কারনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সার্বক্ষণিক হিংসাত্নক অবস্থা বিরাজমান। শুধু রাজনৈতিক কারণে একই গৃহের দুই ভাইয়ের মধ্যেও বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক। যে দল ক্ষমতায় বর্তমান তাদের আয়ত্তে থাকে হাট-বাজার, থানা-পুলিশ থেকে সব কিছু এতে করে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। একদল পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায় আরেকদল পুলিশের সাথে আঁতাত করে আসামী খুঁজে বেড়ায়। এখানে পুলিশ অর্থাৎ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী হওয়ার কথা ছিল নিরপেক্ষ কিন্তু ক্ষমতার দলবদলের সাথে সাথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও যেন পাল্টে যায়। এসব কারণে প্রতিহিংসা বেড়ে যায়। তৃণমূল থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত এই প্রতিহিংসার বিষবাষ্প এমনভাবে ছড়ানো হয় যাতে ভিন্ন দল শ্রেনীর মানুষকে প্রতিপক্ষ মনে করা হয়। দলীয় কার্যক্রম কর্মীদের দীক্ষা এমনভাবে দেয়া হয় যাতে করে তারা উক্ত দলের বাইরে যে কোন দল বা গোষ্ঠীকে সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দলীয় নীতি আদর্শের বাইরে আর কোন নীতি নৈতিকতা থাকতে পারে না বলেই তাদের এমন বিশ্বাস জন্মায়। মূলত এজন্য অশিক্ষিত তরুন সমাজকে এজন্য বেছে নেয়া হয়।

তৃতীয়ত সুশিক্ষিত বিবেকবান মানুষের রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধা আমাদের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে ভাল মানুষের অভাব সেখানে সিস্টেম যতই ভালো হোক না কেন সুশাসন মিলবে না। একটা সিস্টেমে যতগুলো মানুষ জড়িত মিনিমাম মানুষের মাঝে সততা ন্যায়পরায়নতা না থাকলে দূর্নীতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। একেবারে তৃণমূল থেকে যদি আমরা হিসেব করি, ভাল কোন পরিবারের মানুষ এখন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হতে চায় না, কোন সুশিক্ষিত মানুষ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে না, ভদ্র নীতিবান কোন মানুষ পৌরসভার নির্বাচনে স্থান পায় না। তাহলে এই সংকটকালীন সময়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো আদর্শবান মানুষ কোথায় পাওয়া যাবে যেখানে মানুষের জন্য সহযোগিতা ত্রাণ বণ্টন হয় রাজনৈতিক পরিসীমায়। লুটপাতের ঘটনা এখানে খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরের মহল বা প্রশাসন চাইলেও এই লুটপাটের মহড়া কমাতে পারবে না।

চতুর্থত রাজনীতির সাথে প্রশাসনের সম্পর্ক সমঝোতার কারনে সংকটকালীন সময়ে যে ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতায় সাধারন মানুষের জন্য কল্যাণকর পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার কথা এখানে ঘটছে তার উল্টো কিন্তু এখানে একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যের কারনে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলোও রাজনৈতিক তরবীর তদারকিতে ব্যস্ত। বিশেষ করে যখন একটি দল টানা ১২ বছর বা তারও বেশি ক্ষমতা ধরে রাখে তখন প্রশাসনও এখানে নির্দিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্তদের সাথে আঁতাত করে। যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সেখানে জবাবদিহিতার সব পথই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একক কোন ব্যক্তির সিদ্ধান্তে একটি দেশ কখনোই চলতে পারে না কিন্তু এখানে তাই চলছে। ক্ষমতা কেন্দ্রীকরনের যে প্রভাব তা এখনই এই সংকটকালীন সময়ে চরমভাবে ফুটে উঠেছে। মূলত ভাল মানসিকতার মানুষগুলো ক্ষমতা ও দায়িত্বহীন হয়ে পড়ছে।

পরিশেষে আশার আলো এটাই যে বর্তমান তরুন সমাজের একটা অংশ এই দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি সরে আসতে চাইছে। এখানে যদিও বিষয়টা কঠিন তবুও বিশেষ কিছু ব্যক্তিদের আদর্শের কথা বলে যে রাজনৈতিক চর্চা করা হচ্ছে তা যে মোটেও এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য চলনসই নয় তা সুশিক্ষিত সমাজ বুঝতে সক্ষম হয়েছে। পরিবারভিত্তিক দলীয় স্বার্থসিদ্ধির যে রাজনীতি তা একটা দেশ জাতির জন্য মোটেও দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর নয় তা এই সংকটকালীন সময়ে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে চেষ্টা ছিল তা মোটেও অপচেষ্টা ছিল না। কারন দলীয় বৃত্তে থাকা নেতৃস্থানীয়দের গলাবাজী যত বড় হোক না কেন এটা কখনোই দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কল্যানে নয়। লক্ষ কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও দেশের কোটি মানুষের আর্থিক অবস্থা এই সংকটকালীন সময়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটা কথা বলে শেষ করতে করতে চাই, এই সংকটকালীন সময়ে দলীয় বৃত্ত থেকে বের হয়ে মানুষের পাশে না দাঁড়ালে এটা একটা ভয়ানক রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিবে যা /১১ এর চেয়েও শক্তিশালী হবে কারন এবার মানুষ অধিকার আদায়ে অনেক বেশি সোচ্চার।

এম. রহমান আরিফ

 

সচেতন নাগরিক

 

Add comment

Security code
Refresh

About directory

Market Bangladesh is a dynamic online directory. It help to increase and expands business. One can create firms or shops profile and add images of products & services with the help of our representatives and also create Offer and Events. It will effective and efficient to all classes of people and business.Continue

User Login



Not registered yet?

Join the system.

Create an account